নকুলের মহালয়া

রাত পেরোলেই মহালয়া। নকুলের তো ঘুম মাথায় উঠেছে। যদি বেশি ঘুমিয়ে পড়ে তাহলে তো মুস্কিল হতে পারে। তাই আজ জেগে থাকাটাই কাম্য। পাশের ঘরে দাদার নাক ডাকার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। বাবা আর মা বোধয় খাওয়া-দাওয়া শেষ করেছে। একটু পরে ওরাও শুয়ে পড়বে। তারপরে নকুল সময় কাটাবে কি করে? গভীর ভাবনায় পড়ল সে।

আস্তে আস্তে ঘরের সব কটা আলো নিভে গেলো। এক-দুই-তিন-চার, মন দিয়ে গুনল নকুল। তার মানে বাবা মা এর খাওয়া-দাওয়ার পর্ব মিটল। এবারে সে নেহাতি একা। মন দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল সে। অন্ধকার ঘরে ঘড়ি দেখাও মুস্কিল। তাও যা মনে হচ্ছে, ঘণ্টা পাঁচেক বাকি আছে মহালয়া শুরু হতে। দাদার নাক ডাকার আওয়াজটা আরো তীব্র হল। দীর্ঘশ্বাস ফেলল নকুল। এইভাবে রাত কাটানো কি সহজ কথা?

“তুই এখনো ছোট আছিস”, বলে বলে তো আর মোবাইল ফোনটাও দিল না বাড়ির কেউ। দরকার মত ওরা নকুলকে ছোট আর বড় বানায়। ঘরের কাজ না করলে বলে, “তুই কি এখনো ছোট আছিস নাকি?” আর মোবাইল চাইলেই বলে, “ছোটদের ওইসব নিতে নেই। যাও গিয়ে খাতায় ছবি আঁকো!” কত খাতা যে শুরু হল আর শেষ হল, সেই হিসেব কেউ রাখেনি। এই করে করে স্কুলের কত প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়ে গেলো সে। যাক, সে কথা। এখন মোবাইলটা থাকলে খানিকটা সময় কাটানো যেত। সেই সুখ আর নেই তার কপালে। তবে সে সত্যিটা জানে। বাবা-মায়ের কাছে অত টাকা নেই যে সবাই একটা করে মোবাইল পাবে। রাত খানিক গভীর হল এই চিন্তা, সেই চিন্তা করে।

হঠাৎ দুম-দাম ঘরের জানলা পড়তে শুরু করল। প্রথমটা তো নকুল হকচকিয়ে গিয়ে পাশবালিশটা আঁকড়ে ধরে মুখ লুকিয়ে ফেলল। তারপরে বুঝল ঝড় উঠেছে খুব জোড়ে। ভুতের সিনেমাগুলো দেখে দেখে সত্যি তার মাথাটা গেছে। মাঝরাতে কি ভুত আসবে? তাও আবার মহালয়ার আগে! একটু হলেও তো দুর্গা–মা কে ভয় করে ভুতের, নাকি? আবার দড়াম করে জানলাটা পড়তে লাফ মেরে উঠল সে। মা বলেছিল বটে, জানলা টা বন্ধ করে শুতে। কাজে ফাঁকি দেবে বলে ঘুমের ভান করে পড়েছিল সে। মা সব বোঝে! এক ঝলক দেখে চলে গেছে তাহলে, বন্ধ আর করেনি। ইশ! এই জন্যেই আর সিনেমা লাইনএ যাওয়া হবে না। মা যদি দেখেই বুঝে ফেলে, বাকিরা তো ধরেই ফেলবে! এইবারে বন্ধ করতেই হবে। আওয়াজ শুনে মা যদি চলে আসে, তাহলে আর রক্ষে নেই।

জানলার পাশে গিয়ে তো নকুলের চোখ ছানাবড়া! একি দেখছে সে?

বাজ পড়ছে খুব জোড়ে আর সেই আলোতে পরিষ্কার দেখা যাছে যে আকাশ থেকে একটা মঞ্চ নেমে আসছে। চোখ কচলাতে কচলাতে আবার তাকাল আকাশের দিকে। নাহ! একটা প্রকাণ্ড মঞ্চ-ই বটে! আর মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বয়ং দুর্গা–মা! নকুল স্বপ্নে ঠিক যেমনটা কল্পনা করেছে, ঠিক তেমনটাই দেখতে। দশটা হাত নেই, দুটো হাত। আর মুখটা একবারে মা-এর মুখ বসানো। কিন্তু একি – এইটা বাস্তবে হয় নাকি! দাদাকে ডাকবে? নাহ, যা নাক ডেকে ঘুমচ্ছে, শত চেষ্টাতেও ঘুম ভাঙবে বলে মনে হয় না। তার চেয়ে বরং ও একাই দেখুক এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য।

আবার আকাশের দিকে মন দিলো নকুল। হঠাৎ মঞ্চ বানিয়ে নিচে আসার প্রয়োজন হল কেন? এটা ভেবেই জিভ-কাটল সে। একরত্তি ছেলে কি জিজ্ঞেস করতে পারে নাকি যে ঠাকুর কেন কি করছে? মা তো নিজেই বলে, “ঠাকুর-দেবতার ইচ্ছে বোঝে কার সাধ্য!” নাহলে কি আর তার ছোট্ট বোন এইভাবে তাদের ছেড়ে চলে যায়ে? হঠাৎ তার চোখ পড়ল মঞ্চের বাঁদিকের কোনে। একি – শিব ঠাকুর না? ওমা, তাই তো! হাতে ছিলিম নিয়ে বসে আছেন দিব্যি। সেই তো, চারিদিকে যা দুরবস্থা, দুর্গামাকে কি আর একা ছেড়ে দেবেন? সব বাড়িতে ওনার এখন ভক্তের ছড়াছড়ি। শিব ঠাকুর বোধহয় ফোন-এ সময়-দিন ঠিক করে দেবেন। বাড়িতে দেখেছে নকুল। মা-এর যেইদিন খুব কাজের চাপ থাকে, বাবা মা-এর ফোন গুলো ধরে কথা বলে কাগজে লিখে নেয়। পরে মা সেইগুলো দেখে নেয়। দেখে মন টা জুড়িয়ে গেলো নকুলের। যাক, পুরো দায়িত্বটা একা দুর্গা ঠাকুর এর অপরে পড়েনি তাহলে। “সংসার চালানো কি সহজ কথা?” এই কথাটা মা-এর মুখে কতবার শুনেছে নকুল। দুর্গা ঠাকুরকে তো আবার পুরো বিশ্ব-সংসার চালাতে হয়!

মঞ্চে আলো জ্বলে উঠল। এইবারে বোধয় কিছু হবে। দুর্গা ঠাকুর শিব ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লেন। পরক্ষণেই কথা বলে উঠলেন দুর্গা-মা। কি মধুর সেই গলা। আহা, যেন কেউ কানে মধু ঢেলেছে। কিন্তু ঘোর কাটল দুর্গা-মায়ের কথা শুনে।

“…এই বছর আমি মর্তধামে আসতে পারব না। স্বর্গ থেকে বেরনো বারণ আমাদের। ওপর থেকে জোরদার তদারকি চলছে মর্তধামে করোনার সংক্রমন নিয়ে। এই বছরে আমি আমার বাপের বাড়ি …”

গলা ক্ষীণ হয়ে গেলো দুর্গা-মায়ের।

নকুলের তো মাথায় হাত। এতদিন সে ভাবছিল ঠিকই, যে এই বছর দুর্গা পুজোতে কি হবে, তবে একেবারে সমস্ত স্বপ্ন যে এইভাবে ভেস্তে যাবে, সেইটা তো একেবারে ভাবেনি। মাস্ক পরে কি দুর্গা পুজো দেখতে যাওয়া যেত না? না হয় লাইন-এই দাঁড়িয়ে দেখত, কিছু ধরতও না। মা যদিও তার এই পরিকল্পনায় শুরু থেকেই বাধা দিয়েছে, তবু দুর্গা-মাও যে তেমনটা করবে, এটা সে একদম ভাবেনি। কিন্ত দুর্গা-মায়ের সমস্যাটা কি?

“…পাসপোর্ট এখনো সক্রিয়, কিন্তু ভিসা পেলাম না আমরা কেউ। গণেশ তো মহারাষ্ট্রতেও যেতে পারলো না এবারে। দুঃখ করে কতদিন বসে ছিল। আমিই ঘরে মোদক বানিয়ে দিলাম। ভিডিও কল-এ কি আর খাবার পাওয়া যায়?”

নকুল এইবারে নড়েচড়ে উঠল। ভিডিও-কল এ দুর্গাপূজা? দুর্গা-মা যেন তার কথা শুনে নিলেন। এইবারে বুঝিয়ে বললেন।

“আমরা সকলে স্বর্গ থেকে আংশগ্রহণ করবো।” 

মনটা ভারী হয়ে গেলো নকুলের। তার তো ফোন নেই। তাহলে কি দুর্গা পূজা বাদ?

“না না, ফোন দরকার নেই। আরে, ফোন কি আর সবার ঘরে আছে? আমি তো সকলের মা। আমি কি আমার বাচ্চাদের বঞ্চিত করবো নাকি? আপনারা স্বর্গের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন আমাদের।”

হাঁফ ছেড়ে বাঁচল নকুল।

“শুধু সকলের কাছে একটাই অনুরোধ। আপনারা ঘরের মধ্যে সাবধানে থাকুন। নিজে সুস্থ থাকুন, আর সবার খেয়াল রাখুন। এই পুজোটা আপনার, আমার, সকলের। কি, মনে থাকবে তো?”

নকুল ঘাড় নাড়ল। মনে থাকবে বৈকি। এরকম কখনও আগে ঘটেছে নাকি যে সে ভুলে যাবে?

একে একে দুর্গা-মা এর ছেলে মেয়েরা মঞ্চে এলো। তাদের মুখ দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে যে তারা খুবই দুঃখিত। কিন্তু এই বছরটা যে অন্য বছরের মত না, সেটা তো তারাও জানে। দুর্গা-মা এইবারে একে একে সকলকে বলতে দিলেন। প্রথমে এগিয়ে এলো মা-লক্ষ্মী।

“এইবারে সকলে টাকা যত্ন করে রাখবেন। গরিব দুঃখীদের আপনারা সাহায্য করবেন। যারা সারা বছর কাজের লোকের সাহায্য নেন, জেনে রাখবেন, এখন তাদের আপনাকে খুব দরকার। যদি আপনারা পরের বছর আমাকে কাছে পেতে চান, এই বছর আপনারা তাদের টাকা বাকি রাখবেন না দয়া করে। মাসে মাসে তাদের তাদের যথাযথ মাইনে দেবেন।”

নকুল মনে মনে ভেবে নিলো। তার মা পুনি-মাসিকে কাজে ডাকছে না ঠিকই, তবে তাকে বলে রেখেছে মাসের ১ তারিখে এসে টাকা নিয়ে যেতে। যাক, তাহলে পরের বছর মা-লক্ষ্মী ঘরে আসবেন।

মা-লক্ষ্মী সরে যেতেই মা-সরস্বতী এলেন। উনি বাচ্চাদের আর শিক্ষক-শিক্ষিকার উদ্দ্যেশে কিছু কথা বললেন। নকুলের মন-খারাপ হয়ে গেলো। সেই ছয় মাস ধরে স্কুল বন্ধ। মোবাইল-এ ক্লাস শুরু হওয়ার কথা হয়েছিল বটে। তবে, সবার হাতে মোবাইল নেই বলে স্কুল থেকে ব্যাবস্থা করে উঠতে পারেনি। শহরের কিছু স্কুল যদিও করতে পেরেছে। সেই ঘরে সবার কাছে একটা করে মোবাইল আছে বোধহয়।

নকুলের আর বাকিটা শোনার ইচ্ছে নেই। ওনাদের দেখেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো যে। কাল মহালয়া কি হবে? নাকি সেটাও এই বছরের মত বাদ?

প্রশ্ন নিয়ে ওপরে তাকাতেই নকুল দেখল যে দুর্গা-মা তার দিকে তাকিয়ে আছেন, করুণ চোখে। ঠিক যেন তাকে উদ্দেশ্য করেই বললেন, “হবে রে হবে, মহালয়া হবে। কাল কান পেতে শুনিস, ভোরবেলা শুনতে পাবি। ভাল থাকিস নকুল, আসছে বছর আবার হবে!”

নকুল এক্কেবারে ঘাবড়ে গেলো এইবারে। উনি তো নকুল এর নাম নিলেন! মা কি জানেন যে এই প্রকাণ্ড বিশ্ব-সংসারে নকুল বলে একটা একরত্তি ছেলে আছে? বুকটা আনন্দে ভরে উঠল। একি, রাত কি শেষ হয়ে আসছে? তাহলে তো এইবার…

“আমরা বাড়ি ফিরলাম এইবারে। এই বছরে আমাকে পেতে হলে পূজা নয়, মানুষের পাশে থাকুন, তাদের সাহায্য করুন। সকলকে ভালবাসুন – আমার পূজা করতে হবে না, সবাইকে শ্রদ্ধা করুন, সবার সাহায্য করুন। তাহলেই আমাকে কাছে পাবেন।”

মঞ্চটা মিলিয়ে গেলো কেমন রাতের ভেতরে। ঝড় উঠল খুব জোড়ে। দড়াম করে জানলাটা পড়ল আবার। কোনো রকমে জানলাটা বন্ধ করে খাটে এসে শুয়ে পড়ল নকুল। কি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা! সকালে উঠে কাকে আগে বলবে সে? ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, সে নিজেই জানে না।

পাশের ঘর থেকে ভেসে এলো মহালয়া। দেবী আসছেন। সকলে উঠে পড়ে শুনতে লাগল, শুধু ঘুমিয়ে থাকল একরত্তি নকুল। সে জানে, এই বছরে দুর্গা-মা কে কি করে পেতে হবে। তার বাড়িতেই আছে দুর্গা-মা। মনে মনে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হল যে কাল সকালে সে তার মা-এর সব কাজ করে দেবে।

Published by Leena Bhattacharya

A researcher who finds solace in social work

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: